মাহমুদুর রহমানের গল্প পূন্য

ঢেঁকিতে চাল ছাঁটা হচ্ছে। পিরুলি বেগম রাগে গজগজ করছেন।এখন চাল ছাঁটা মেশিন বের হয়েছে।শুভদিয়ার বাজারে সেই মেশিনও চলে এসেছে। মাত্র দশ পয়সা হলে দুই পোকে ধান ছাঁটা যায়। (পোকে হচ্ছে বেত দিয়ে তৈরি ধান মাপা একক।) কত সহজ সমাধান।এখন গ্রামের অনেকেই ধান ছাঁটাতে শুভদিয়ার বাজারে যায়। অথচ এবাড়ির কর্তা জয়নাল মহুরি সেটা করবেননা। তার বক্তব্য- ঢেঁকি ছাঁটা চাল মানে পুষ্টিকর খাদ্য।

জয়নাল মহুরি ভাত খাচ্ছিলেন। কই মাছের ঝোল, আলু ফুলকপি দিয়ে তরকারি। রান্না ভাল হয়েছে। সুখাদ্য হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার নিয়ামত। এই নিয়ামত গ্রহনের সময় তিনি দিন দুনিয়ার কথা পছন্দ করেননা। তিনি যেটা অপছন্দ করেন তার স্ত্রী পিরুলি বেগম সেই কাজটা বেশি বেশি করেন।খাওয়ার সময় দুনিয়ার আজাইরা প্যাঁচাল শুরু করবে। এখন যেমন শুরু করেছে।

“শুনলাম আপনি নাকি আনু বুড়ির জমিটা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতেছেন। আপনার সঙ্গে শরীফমিয়া ও নাকি আছে। সেতো লোক ভালনা”।

“তোমারে এই সব কে বলছে? তুমি থাকো বাড়ির অন্দরে পর্দা-পুসিদার মধ্যে। এইসব ফালতু কথা তোমার কাছে ক্যামনে পাস হয় আল্লাহ্‌ মাবুদ জানে”।

“এইসব কথাকি আর গোপন থাকে। আনু বুড়ির নিজের কোন ছেলেমেয়ে নাই। ছিল অই বোনের মেয়েডা। তারামনবানু। আনুবুড়ি বাইচা থাকতে তো তারামনই দিনরাইত এই বুড়ি মানুষটারে টানছে (দেখা শুনাকরা)। আনু বুড়িএই জমিডা তারে দিয়ে গেছে। কতটুকুই বা জমি। সারা বাড়ি দশ কাঠা। এই নিয়ে মানুষ ক্যান তার পিছে লাগবে”।

“শোন পিরুলি বেগম, এর আগেও তোমারে বলছি- খাওয়ার সময় দুনিয়ার দরবার নিয়া আমার সঙ্গে প্যাঁচাল পাড়বানা”।

“আপনার পাওদুইটা ধরি। আমাগে কিছু ছিলনা।আল্লাহ্‌ এখন সব দিছে। আপনি মহুরি হইছেন। আপনি মানুষের জমি রক্ষা করবেন।উল্টা আপনি অন্যের জমির উপর নজর দেন। এইগুলা কি আল্লাহ্‌ মাফ করবে কন”।

পিরুলি বেগম অতি বুঝদার মহিলা। বুঝদার মহিলার সাথে রং তামসা চলে। সংসার চলেনা। সেই সংসার সে গত দেড় যুগ ধরে করে আসছে। দাঁতের সঙ্গে দাত চেপে ধরে। মেয়েছেলে থাকবে মেয়েছেলের স্থানে। রান্নাঘর টু বেডরুম। কিন্তু তার বিচরন সর্বত্র। তারকাছে জিজ্ঞাশ করলে হয়ত শেখ সাহেবের ছয়দফার খবর ও জানা যেতে পারে। এই হল অবস্থা।

জয়নাল মহুরি একবার ভাবলেন- থালার ভাতের মধ্যেই হাত ধুয়ে ফেলবেন। পর মুহূর্তে সিদ্ধান্ত বদলালেন। এইসব মেয়েছেলের উপর রাগ দেখিয়ে খাদ্য নষ্ট করার কোন মানে হয়না। খাদ্য হচ্ছে আল্লাহ্‌ তায়ালার অশেষ নেয়ামত।

 

একতলা বিল্ডিং ঘর। সুনসান বারান্দা। বারান্দার অংশটুকু মাটির তৈরি টালি দিয়ে ছাওয়া।বারান্দার মাঝে একটি্ ডালায় নানা রকম লতাপাতা সাজানো। কোনটা পাথর কুচি, কোনটা বাসক। বাড়িতে কবিরাজ আনা হয়েছে। খুলনার ফুলতলা থেকে। জনাব আফতাব হেকিম। খুব নামকরা কবিরাজ। মৃতপ্রায় রোগীর কানের কাছে আফতাব হেকিমের নাম নেওয়া হলে রোগী আরও কয়েকদিন হায়াত পায়। এই অঞ্চলে লোকমুখে এমন কথাবার্তা শোনা যায়। তবে এই বাড়িতে এমন গুরুত্বর কোন রোগী নেই। তবে যে আছে তার অবস্থা ও একেবারে কমনা।

বাড়ির প্রধান কর্তা জনাব মাহফুজ আলী। বয়স সত্তরের কাছাকাছি। কিছুদিন হল সে কোন খাবার খেয়ে হজম করতে পারছেনা। তার খাবার এখন আতব চালের ফেনা জাউভাত। মশলা ছাড়া লাউ তরকারি দিয়ে সিংগি মাছের পাতলা ঝোল। সে খাবারও পেটে সইছেনা। খাওয়ার পাঁচ মিনিটের মধ্যে দাস্থ্য-বমি। তার অসুস্থতার খবর শুভদিয়া পেরিয়ে আশেপাশের দুইএক গ্রাম ছড়িয়ে পড়েছে। আত্নিয় স্বজন তাকে দেখতে আসছে।বাড়ির ঘর গুলো এখন মেয়ে জামাই আর অন্যান্য আত্নিয় দিয়ে ভরপুর। তার কানে আসছে- আত্নিয় স্বজন আর গ্রামের অনেকেই তাকে ঘিরে নানারকম কথা বলাবলি করছে। মাহফুজ আলী শিকদারের মত মানুষ। যার তিনশ বিঘা জমি। গোয়াল ভরা গরু। পুকুর ভরা মাছ। সারা বছর মাঠ ভর্তি ফসল। অথচ আল্লাহ পাক তার রুজিও উঠায়ে নিছেন। এদের বক্তব্য আল্লাহ পাক ওপরে বসে বলছেন-“বান্দা তোমারে সব সম্পত্তির মালিক বানায়ে দেওয়া হবে। কিন্তু রুজি দেওয়া হবেনা এই হল তোমার নিয়তি”। এইখানে কারো কিছু করার নাই।

মাহফুজ আলী ডালার সামনে বসা। হেকিম সাহেবের জন্য অপেক্ষা করছেন। তার পেটের চিকিৎসা করা হবে। কবিরাজ এখনও আসছেনা কেন? সে ডাক দেয়। “ মনসুর, ও মনসুর”। কোন সাড়া নেই। কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবারও ডাকেন।

“মনসুর, ও মনসুর।হারামজাদা গুলো যায় কোহানে ডাকলি মোটে পাওয়া যায়না ”। মাহফুজ আলী শিকদারের সার্বক্ষণিক পাশে থাকা কাজের লোক মনসুর হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে। এসেই তার দেরীর কারন ব্যাখ্যা শুরু করে।

“খালুজান, হেকিম সাহেব ধ্যান শেষ করে নাস্তা করবেন। তারপর রোগী দেখবেন। খালাম্মা নাস্তা তৈয়ের করতেছেন। আমি যোগার জন্তে ব্যাস্ত ছিলাম। হেকিম সাহেবের নাস্তা বলে কথা। তিনি বেহানে ছয়ডা সিদ্ধ ডিম খান। এক লিটার দুধের সাথে মধু। আমাগে বাড়িতে যে মধু আছে তাতে চলবেনা। সাজো ( তৎক্ষণাৎ) চাক ভাঙ্গা মধু লাগবে”।

তার চেহারায় একটা বিরক্তি ভাব ফুটে উঠল। হেকিম সাহেবের এই নাস্তা কাহিনী শোনার পর।

“শুয়োরের বাচ্চা, অত কতা কইস কি জন্নি ? সাজো মধু আমি তোর হেকিম সাহেবের পেছন দিয়ে ভরে দেব”।

এই গালিতে মনসুরের মাঝে তেমন কোন পরিবর্তন দেখা যায়না। সে প্রতিনিয়ত এইসব গালি শুনতে অভ্যস্ত। খালুজানের এই একটা স্বভাব। তিনি গালি ছাড়া কথা বলতে পারেননা।পাঁচটা লাইন বললে তার মধ্যে একটা গালি থাকবে। কারো প্রশংসা করতে গেলেও তিনি গালি ছাড়া করতে পারেননা। হয়ত বললেন- ও মনসুর, নিরেন মাস্টাররে খবর দিতি কইছিলাম দিছিস? মানুষটার সাথে কয়ডা কতা ছিল। বুঝলি মনসুর, শুয়োরের বাচ্চা লোকটা বড় ভালোরে। বড় অমায়িক”। শুধু পার্থক্য প্রশংশা করে দেওয়া গালিতে বেশ খানিকটা আবেগ ঝরে পড়ে। যেন এই গালি ছাড়া তার প্রতি ভালবাসা পূর্ণ হতনা। গালি সমেত কারো প্রশংশা এত সুন্দর ভাবে করা যায় তার সাথে আলাপ না হলে বোঝা মুশকিল। তার এই গালির স্বভাব নিয়ে এই অঞ্চলে একটা কাহিনী প্রচলন আছে। একবার খান সাহেব (খান এ সবুর)এই অঞ্চলে মুসলিম লীগের প্রোগ্রাম করতে আসল। তিনি মাহফুজ আলী সাহেবরে বললেন- আলী সাহেব, আপনিতো দলটারে এই অঞ্চলে সামনে আগায়ে নিলেন। কিন্ত দলের নেতা কর্মীদের আপনার বিরুদ্ধে একটা অভিযোগ আছে। আপনি নাকি তাদের প্রচুর গালিগালাজ করেন”। “ খান সাহেব, আমি গালি গালাজ করি। কোন শুয়োরের বাচ্চা আপনারে এইডা কইছে খালি একটু কন” বিভিন্ন সময় বাজারের চায়ের দোকানে এই কাহিনী নিয়ে আলোচনা হয়। উপস্থিত সবাই অট্ট হাসিতে ফেটে পড়ে। এই গল্প তাদের জন্য একটা চরম বিনোদন। গালি রাগ প্রশমনের জন্য একটা ভাল ঔষধ। গালি যত উঁচু মানের ( অশ্লিলতার দিক থেকে) রাগ প্রশমন তত দ্রুত হবে।

মাহফুজ আলিকে এখন বেশ শান্ত দেখাচ্ছে। তিনি বললেন- “ মনসুর, হোসেন শিকদাররে আসতে কইছিলাম। তারে কি খবর দেওয়া হইছে?

“জে, খালুজান। তিনি কাচারি ঘরে বসে আছে। খালাম্মা কইছে আপনার নাস্তার পর তারে নিয়ে আসতে”।

“যা, তারে এইখানে এখনই নিয়ে আয়”।

মাহফুজ আলী চেয়ারে আধশোয়া হয়ে বসা। তার চোখ বন্ধ। সামনে হোসেন শিকদার । এই লোক কয়েক বছর হল ফকিরহাট বাজারে টালি,চুন, টিন এই সব নির্মাণ সামগ্রীর দোকান দিয়েছে।নদীর পাড়ে ভাঁটা করে ইট কাটাচ্ছে। সে এখন অনেক টাকার মালিক হয়ে গেছে। জয়নাল মহুরির নিকট থেকে আনুবুড়ির ঝামেলার জমিটা কিনবে। এই অঞ্চলে ঝামেলার জমিজমা মানে মাহফুজ আলীর দায়িত্ব।এই বিষয়টা হোসেন শিকদার বোধ হয় ভুলে গেছে। তাকে একটু মনে করানো দরকার। আজকাল অত্র অঞ্চলে অনেক ক্ষমতাবানদের আগমন ঘটছে। সবাই কি বুঝে যাচ্ছে-তার দিন শেষ হয়ে আসছে।

নীরবতা ভেঙে সে কথা শুরু করল – “কি খবর শিকদার, শোনলাম তুমি নাকি দেদারসে জমিজমা কিনতেছ?

“কি যে কন ভাইজান, আমি হইলাম গরিব গোরা মানুষ। দেদারসে জমি কিনব কিভাবে? জয়নাল মহুরির কাছ থেকে একটা জমি কেনার কথা চলছে”।

মাহফুজ আলী লক্ষ্য করল “গরিব গোরা মানুষ” শব্দ গুলো উচ্চারণ করার সময় তার কণ্ঠে একটা অন্য রকম অহমিকা ঝরে পড়ছে। এটা ভাল লক্ষন না। একে আর বেশি বাড়তে দেওয়া ঠিক হবেনা। আস্তে আস্তে ডোজ দিতে হবে। হোমিও পেথি ঔষধের মত। প্রথমেই বেশি পাওয়ার সহ্য করতে পারবেনা।

“শিকদার, তুমিতো দেখি ভাল মানুষের পাল্লায় পড়ছ। জয়নাল মহুরি। যার পেট ভর্তি শুধু প্যাঁচ আর প্যাঁচ। বিশ্বাস না হয় রাইতের বেলা তুমি তারে এক পিচ পেরেক খাওয়ায়ে দাও। সক্কাল বেলা দেখবা তার পায়খানার রাস্তা দিয়া একটা ফ্রেশ স্ক্রু বাইর হইতেছে। মিয়া, বোঝলা কিছু”?

“আনুবুড়ি তার জমিটা জয়নাল মহুরির কাছে বিক্রি করেছে। আমি সব কাগজ পত্র দেকছি। একেবারে বাগেরহাট অফিসে গিয়া দেকছি”।

“কাগজ পত্র থাকলেই সে মালিক হয়ে গেল?”

“জমি না কিনলে অফিসের কাগজ পত্রে তার নাম আসলো ক্যামনে”?

“সেই জন্যিইতো কইলাম এইসব জয়নাল মহুরির প্যাঁচ”।

“আমিতো তারে বায়না করে ফেলছি। নগদ দুইশ টাকা”।

“বায়না ফেরত চাও। ফেরত না দিলে আমারে জানাবা। ক্যামনে আদায় করতে হয় এইসব আমি আবার ভাল বুঝি। অবশ্য এইজন্য তোমার পঞ্চাশ খরচ হয়ে যাবে। লাঠেল (লাঠিয়াল) বাহিনী তো আর মাগনা কাজ করবেনা। কি বল? পুরা টাকাতো জলেই যাবে। তাও যেই সেই জলে না। এক্কেবারে মধুমতি গাঙ্গের মাঝখানে। উদ্ধারের কোন লাইন পাবানা।তারচেয়ে বাবা পঞ্চাশের উপর দিয়ে যাক”।

“ আচ্ছা, ভাইজান আমি উঠি”

কথাটা বলে হোসেন শিকদার দাড়িয়ে পড়ে। মাহফুজ আলী তরফদার তার চোখ বরাবর তাকাল। সেই দিনের শিকদার আজ পয়সার মালিক হয়ে গেছে। মাহফুজ আলী তরফদারের সামনে থেকে হুট করে উঠে পড়ে।কত বড় বেয়াদব। পিপীলিকার পাখানা গজায় মরিবার তরে। আর বেয়াদবের গিট্টু ঢিলা হয় ল্যাংটা হবার তরে। এই বেয়াদবের লুঙ্গির গিট্টু ইতিমধ্যে ঢিলা হয়ে গেছে। এখন ল্যাংটা হতে বাকি। এইজন্য শুধু ঠাণ্ডা মাথায় একটা ট্যাবলেট দিতে হবে। কলসির পানির মত ঠাণ্ডা।

“শিকদার, আমি কথাতো শেষ করিনাই। হুট কইরে উঠে পড়লা। আমি জানি, ইয়াং পোলাপানদের পাছায় স্প্রিং লাগানো থাকে। পাছা কোন কিছুর সাথে স্থির থাকেনা। ফটফট শুধু লাফ দেয়। এহন দেখতেছি স্প্রিং তোমার পাছায় ও একটা লাগানো। মাথা ঠাণ্ডা কর শিকদার, মাথা ঠাণ্ডা কর। ঝামেলায় পড়লে এই বারান্দায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বইসা থাকবা। সমাধানের কোন কুল কিনারা পাবানা। লালনের সাইয়ের অই গানডা শোননাই- সময় গেলে সাধন হবেনা। আমি তো এই গান আমার জৈবন বয়সে শুনছি। বাড়িতে কাউরে কিছু না কইয়ে কুষ্টিয়ায় চলে গেলাম সাইজির গান শুনতে।সে বাইচা থাকতে তার নিজ কণ্ঠে এই গান শুনে আসলাম। কি আছে জিবনে কও”। মাহফুজ আলী চেয়ারের হাতলটাকে তবলা বানিয়ে বাজাচ্ছেন আর গাইছেন-“সময় গেলে সাধন হবেনা”। ট্যাবলেটে কাজ শুরু করেছে। বেয়াদবটার লুঙ্গি কোমর থেকে হাঁটু অব্দি চলে এসেছে এখন শুধু নিচে পড়তে বাকি। হোসেন শিকদারকে বেশ বিমর্ষ লাগছে। যেন তার মাথায় পুরা আকাশ ভেঙে পড়েছে। পৌষ মাসের ঝকঝকে নীল আকাশ না। বৈশাখ মাসের মেঘঢাকা কালো আকাশ। মাহফুজ আলী সেই মুখের দিকে তাকিয়ে একটা হাসি দেয়। যে হাসিটা ঠোটের কোনে হালকা করে ঝুলে থাকে। যেন উঠানে তারের উপর একটা ব্রেশিয়ার ঝুলছে। সুন্দরী রূপবতী কোন রমণীর গোলাপি ব্রেশিয়ার।অন্যের এই বিমর্ষ রূপ দেখতে কেন জানি তার খুব ভাল লাগে। ক্ষমতার ভাললাগা।

“আচ্ছা শিকদার তুমি তাইলে যাও। আমার আবার চিকিতসার সময় হয়ে আসছে। যাওয়ার আগে নাস্তা কইরে যাও। ও মনসুর তোর শিকদার কাকারে নাস্তা দে”।

হোসেন শিকদারের যথেষ্ট ক্ষুধা লেগেছে। কিন্তু এখন এখানে নাস্তা করবার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা নাই। সে সম্ভবত কঠিন ঝামেলার মধ্যে পড়ে গেছে। আল্লামাবুদই জানে এই জমি নিয়ে আর কত চিতল বোয়ালরা পানিতে নামছে। আর সেতো কেবল চুনোপুঁটি থেকে স্বরপুঁটি হওয়ার চেষ্টা করছে। নাস্তাতো দুরের কথা আগামী দুদিন তার গলা দিয়ে কিছু ঢুকবে কিনা সন্দেহ।ঘটনা মোড় খেয়েছে। খাবার ইচ্ছা না থাকলেও এই নাস্তা এখন তার করতে হবে। সে এখন চিপায় পড়েছে। এই চিপায় পড়া অবস্থায় ক্ষমতাবানদের কথা ফেলতে নাই। তাহলে সেই চিপা সরু হতেহতে একটা সময় মুখটাই বন্ধ হয়ে যাবে। বের হবার কোন পথ থাকবেনা।

মাহফুজ আলী তরফদার বুঝতে পারেন। পরিবেশে একটু গরম হাওয়া বইতে শুরু করেছে। হাওয়া ঠাণ্ডা করা দরকার।তিনি আলোচনার প্রসঙ্গ বদলালেন।

“আজেকের নাস্তাটা ভাল আছে শিকদার। চাউলের গুঁড়ার রুটি আর গুরুর গোস্ত। আইড়ে গরুর ফ্রেশ গোস্ত। আমার বাড়িতো এখন একটা হাম্মাম খানা। আমার অসুস্থতা উদযাপন চলতিছে।দেদারসে মেহমান আসতিছে আর যাতিছে। তোমার ভাবিজানতো সারাদিন চুলার পিঠেই (রান্নাঘর) থাকে। কাজের বিটিগে হাতে কিছু ছাইরে দেওয়া যায়না।বুঝলা। সব চোর। দুনিয়া থেকে ভাল মানুষ সব উঠে যাচ্ছে”।

কথাটা বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। দুনিয়া থেকে ভালমানুষ উঠে যাওয়ায় তিনি যেন ভয়াবহ রকম মর্মাহত।

 

চৈত্র মাসের ভর দুপুর। একদল বলশালী পুরুষ তারামন বিবির বাড়িতে ঢুকে পরে। উদ্দেশ্য-ভিটেবাড়ি দখল নেওয়া। তারামন বিবি তখন রান্না করছিল। আমন ধানের চাউলের ভাত। কিছুতেই সিদ্ধ হতে চায়না। পুরুষ দলের একজন বলল-এই বিটি (মহিলা) আজকে সইন্ধের মধ্যি ভিটেবাড়ি ছাইড়ে দিবি। এই জমি এহন থেকে মাহফুজ আলী সাহেবের। আনু বুড়ি তার কাছে বিক্রি করছে। কচকচা নগদ টেকায়। সাহেবের কাছে পাক্কা কাগজ পত্তর আছে।

তারামন বিবি তাদেরকে কিছু বলতে চাচ্ছিল। তখন একজন তার দিকে তেড়ে আসল। তৎক্ষণাৎ আর একজন জ্বলন্ত চুলার হাড়িতে লাথি মারল। আধফোটা আমন ধানের ভাত উঠোনময় ছড়িয়ে পড়ল। মুরুব্বি গোছের একজন বলল- এই, মেয়েছেলের গায়ে হাত তুলতে নেই। ওরা হইল মায়ের জাত।

সঙ্গে সঙ্গে অন্য সবাই কথার সমর্থন দিয়ে বলল- হ, হ, ঠিকই কইছেন। তয় সইন্ধের মধ্যি বাড়ি না ছাড়লি কোন মেয়েছেলে মানবনানে”। তারামন বিবির বাড়ির সীমানা পার হতেহতে কিছু লোক তাদের খেয়াল খুশির বেশ কিছু নমুনা রেখে গেল। কেউ হুমকি ধামকি দিয়ে শাঁসাল।“ মেয়েছেলে বলে কিছু বললাম না। না হলি খবর ছেল”। কেউ যাবার সময়ে পথে পড়ে থাকা একটা মাটির পাত্র লাথি দিয়ে ভেঙে ফেলল। একজন বিশ্রী রকম একটা হাসি দিয়ে অপর একজনকে বলল-ভাই, কেসটা সাহেবের না হলি একটা রিস্ক নিয়েই ফেলতাম। বিটির (মহিলার) শরীর স্বাস্থ্য কিন্ত ভালই ছেল”।

লোকগুলো বাড়ির সীমানা পার হচ্ছে। আর পেছনে চিৎকার করে একজন মহিলা কাঁদছে। তারামন বিবি। যিনি গ্রামের মহিলাদের তালিম (পঠিত ধর্মীয় বয়ান) শোনান। যার গলার আওয়াজ সচররাচর কখনো কোন পর পুরুষ শোনেনি। সন্ধ্যা হতেহতে তারামন বিবি শুভদিয়া গ্রাম ত্যাগ করেন। যাবার সময় সারা পথ ধরে শুভদিয়ার মানুষ গুলোকে অভিশাপ দিতেদিতে যান।

আনু বুড়ির দশ কাঠা জমিকে কেন্দ্র করে শুভদিয়া গ্রামে একটা জটিল রকম প্যাঁচ তৈরি হয়। শরীফ মিয়া , মাহফুজ আলী, জয়নাল মহুরি সবাই ই চায় এই জমির দখল নিতে। মাহফুজ আলী এই নিয়ে হুমকি দিয়েছে। তার দাবি আনুবুড়ি বেচে থাকতে তার নিকট থেকে এক হাজার টাকা কর্জ নিয়েছে। বিনিময়ে এই জমি বন্ধক ছিল। স্ট্যাম্পে টিপ সই সহ লিখিত আছে। দুই বছরের মধ্যে এই টাকা মুনাফা সহ পরিশোধ করতে না পারলে মাহফুজ আলী এই জমির মালিক। কিন্ত মানবিক খাতিরে এতদিন কিছু বলেনি। সে আর অপেক্ষা করতে পারছেনা। মানবতাতো আর কম দেখালেন না। তিনিতো আর হাজি মুহাম্মাদ মহাসিন না। যে হাজার হাজার টাকা ফি সাবিলিল্লাহ বিলি বাট্টা করে দিবেন।

জয়নাল মহুরি বলেছে- আমি ভাই সাধারণ মানুষ। জোর জবরদস্তি করেতো আর আমি জমি নেবনা। আমার কাছে দলিল পত্র। এমন কি আমার নামে সরকারি রেকর্ড পত্র ও হয়ে গেছে। সন্দেহ থাকলে বাগেরহাট সেটেলমেন্ত অফিসে চলে যান। শুভদিয়া মৌজার এই জমির দাগ নাম্বার, খতিয়ান নাম্বার দেখে কাগজ পত্তরে চোখ দুইটা বুলায়ে আসেন। এই জমির বর্তমান আসল মালিকের নাম কি? দেখবেন, চকচকে অক্ষরে লেখা। নাম-জনাব জয়নাল শিকদার। পিং- মৃত জনাব হালিম শিকদার। ঠিকানা- শুভদিয়া উত্তর পাড়া ফকিরহাট, বাগেরহাট। আমি ভাই বুঝি আইন কানুন জোর দখল না।

শরীফ মিয়া ও কম যাচ্ছেননা। তিনি নাকি গুন্ডা পাণ্ডা ঠিক করে রেখেছেন। তাছাড়া শরিফ মিয়ার বাবার বিয়ে ছিল তিন পক্ষে। আপন সত মিলায়ে তারা ভাই ই আছে কুড়ি খানেকের মত। তার বক্তব্য- শালা , সব ধান্দাবাজি শুরু করেছ। দরকার হইলে বংশের সবাই রামদা নিয়া বাইর হয়ে পড়ব। দেখব কোন শালা জমির ধারেবাড়ে আসে। সব কোপায়ে শোয়ায় ফেলায় দেবো।

শোনা যাচ্ছে ইদানিং আরও দুই একটা প্রভাবশালি মহল ও এই দখল দারিত্বে যোগ দিচ্ছে। একেবারে খালি হাতে ছেড়ে দেয়া যায়না। এই দখল যুদ্ধে যদি টিকে থাকা যায় মন্দ কি। একেবারে কমতো না। পুরা আধ বিঘা জমি। শুভদিয়া গ্রাম এইসব উত্তেজনার মধ্য দিয়ে সময় পার করছে।এদিকে নিরব নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে আছে আনুবুড়ির ফাঁকা ভিটে। এখনও কেউ দখল নিচ্ছেনা। মানুষের মধ্যে ও সেই এক উত্তেজনা। এই জমি নিয়ে গ্রামে বড় রকম একটা দাঙ্গা বাঁধবে। রক্তপাত হবে। খুনাখুনি হওয়াটাও অস্বাভাবিক কিছু না। শোনা যায় ইদানিং আনুবুড়ির ফাঁকা বাড়িতে তাড়ি, গাজা এইসব খায়। জুয়ার আসর বসে। কেউকেউ সন্ধার পর ওখানে মেয়ে মানুষের গলার আওয়াজ ও শুনেছে। সম্ভবত বাজে মেয়ে মানুষ। শুভদিয়ার বাজারে নাকি এখন মেয়ে মানুষ পাওয়া যায়। যাদের সাথে টাকার বিনিময়ে ফুর্তি করা যায়।

শুভদিয়া গ্রামে আনুবুড়ির জমি নিয়ে কয়েকটি গ্রুপের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনা চলে আসছে। কেউ ক্ষমতার দাপটে।কেউ আইনি প্যাঁচে। ফলে এই জমিটা এখনও নির্দিষ্ট করে কারো দখলে আসেনি। এই উত্তেজনা প্রশমনে বাগেরহাট মহকুমার প্রধান কর্মকর্তা গ্রামে একদিন সবাইকে নিয়ে বসলেন। এইসব ঝামেলা আর কতদিন চলবে।

বাগেরহাট পর্যন্ত খবর হয়ে যাচ্ছে। এই জমি নিয়ে শুভদিয়া গ্রামে দুদিন পরপর কাইজার (দাংগা) মহড়া চলছে। দীর্ঘ আলোচনা ও বাক বিতণ্ডার পর অবশেষে কর্মকর্তা সাহেব একটা প্রস্তাব রাখলেন।

“ শোনেন, এই জমির কাহিনী আমার বোঝা হয়ে গেছে। দুই একটা লাশ না পড়া পর্যন্ত এইটা ঠাণ্ডা হবার কোন পথ আমি দেখতেছিনা। আজরাইল আলাইহিসাল্লাম এখন শুভদিয়া গ্রামেই মনে হয় আখড়া গাড়ছে। তারচে আসেন সবাই মিলে একখান পূন্যের কাজ করেন”।

এই কথায় উপস্থিত মাহফুজ আলী ,শরীফ মিয়া,জয়নাল মহুরি সহ তাদের সব লোকজনের ভেতর একটা ফিসফাস শুরু হল। শালা কয় কি? এই জমি আবার আনু আনুবুড়িকে ফেরত দিবে নাকি। তাহলে এইখানে কারো মান সন্মান থাকবে। এই কাজ করলেতো প্রমান হয়ে যাবে সবাই মিলে একটা বড় আকাম করা হইছে। ফাইজলামি । শুভদিয়া গ্রামের মান সম্মান নিয়ে কাউকে টানাটানি করতে দেওয়া হবেনা।

“ আপনারা সবাই ফিসফাস বন্ধ করেন। আমারে কথা শেষ করতে দেন।জীবনেতো পাপ কম করেনাই। আসেন এখন এই জমিতে সবাই মিলে একটা মসজিদ দাড় করান। সওয়াবের কাজ। আপনারই এইখানে ইবাদাত বন্দেগী করবেন”।

আবারও কিছুক্ষন ফিসফাস চলল। তারপর সবাই একসাথে বলে উঠল- হ, হ, ভাল কথা বলছেন। এইটাই করা হোক।

নিজেদের মধ্যে কাইজা ফ্যাসাদের অবসানও হবে। আবার একটা পূন্যের কাজ ও হবে।

সবাই আসলে একটা ব্যাপার বুঝে গেছে। জমিটা নিয়ে ঝামেলা এতদূরে গিয়েছে যে এর কোন কূল কিনারা নেই। এখন এইটাই সমাধান হতে পারে।

শুভদিয়া গ্রামে একটা মসজিদের নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে। নির্মাণ কাজ উদ্বোধন করেন বাগেরহাট মহকুমা কর্মকর্তা প্রধান জনাব ইখতিয়ার উদ্দিন সাহেব। এই গ্রামে তার নাম ছড়িয়ে গিয়েছে। খুবই বিচক্ষণ আর ন্যায়পরায়ন একজন মানুষ।

নির্মাণ কাজের জন্য অর্থ সংগ্রহের কাজ চলছে। মসজিদের নির্ধারিত জায়গার সামনে একটা চেয়ার-টেবিল বসানো হয়েছে। একজন মাদ্রাসার তালবেয়ালিমকে(ছাত্র) দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।নাম ফয়জুল করিম। সে চেয়ারে বসে আছে। একটি চোঙ্গা নিয়ে সুর করে বলছে- “ আমার পথচারী মুসলমান দ্বীনই ভাইয়েরা ও আমার পর্দার আড়ালের মা ও বোনেরা। শুভদিয়ার পবিত্র বায়তুল মোয়াজ্জাম জামে মসজিদের নির্মাণ কাজ চলিতেছে। আপনারা আপনাদের যাত্রা পথে দুই- এক পয়সা দান করে মসজিদের নির্মাণ কাজে শরিক হয়ে যান। কতভাবে কত পয়সা নষ্ট হয়ে যায়। কিন্ত আপনার এই দান কখনো বিফলে যাবেনা। এই দান কাল কেয়ামত পর্যন্ত ছদকায়ে জারিয়া হয়ে থাকবে। কাল কেয়ামতের মাঠে এই দান আরশে আজিমের ছায়া হয়ে থাকবে”। পথচারীগন দানে শরীক হয়ে যাচ্ছেন। কেউকেউ বলছেন- ছেলেটার গলার লাহান বড় চমৎকার।