অভিবাসীদের জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘অদৃশ্য দেয়াল’

ভয়াল ১১ সেপ্টেম্বরের ১৭ বছর পূর্তির দিন থেকে কার্যকর হওয়া নতুন বিধিতে আমেরিকার অভিবাসন ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসা হয়েছে। সমালোচকেরা বলছেন, বৈধ অভিবাসীদের দমাতে এটা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন কৌশল। সীমান্তে দেয়াল নির্মাণের ঘোষণা দেওয়া ট্রাম্প তা এখনো কার্যকর করতে না পারলেও নতুন বিধির আড়ালে বৈধ অভিবাসন ঠেকাতে ঠিকই ‘অদৃশ্য দেয়াল’ নির্মাণ করলেন।

গ্রিনকার্ড বা নাগরিকত্বের আবেদনে কোনো ভুল করা হলে আবেদনকারীকে কোনো সুযোগ না দিয়েই, তা বাতিল করার বিধান আরোপ করা হয়েছে। কংগ্রেসে অভিবাসন নিয়ে কোনো আইন প্রস্তাবকে পাশ কাটিয়ে অনেকটা গোপনেই প্রশাসনিক এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

নতুন আরোপিত বিধিতে বলা হয়েছে, কোনো আবেদন বাতিল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমেরিকায় অবস্থানরত সংশ্লিষ্ট আবেদনকারীকে অবৈধ বলে বিবেচনা করা হবে এবং সঙ্গে সঙ্গে তাঁর বিতাড়ন প্রক্রিয়া শুরু হবে।

অভিবাসন আইনজীবীরা বলছেন, সামান্য ভুলের জন্য এভাবে কোনো অভিবাসীকে এভাবে আমেরিকা থেকে বিতাড়নের প্রক্রিয়া শুরু করা নজিরবিহীন। এর ফলে বৈধ-অবৈধ কোনো অভিবাসীর পক্ষেই আর আমেরিকাকে নিরাপদ মনে করার কোনো কারণ নেই।
প্রায় ৭০ লাখ লোক প্রতি বছর আমেরিকার গ্রিনকার্ডের জন্য আবেদন করেন। আইন মেনে বৈধতার এ আবেদনে অনেকে ভুল করেন। অনেকের আবেদনের সঙ্গে তথ্য-প্রমাণের সাদৃশ্য থাকে না। আগের নিয়ম অনুযায়ী, অপূর্ণ আবেদন বা ত্রুটিযুক্ত আবেদন সংশোধন করার জন্য আবেদনকারীকে সুযোগ দেওয়া হতো। কিন্তু ১১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া নতুন বিধিতে এ সুযোগ আর নেই। প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের আবেদন পরখের পরই তা পুরোপুরি বাতিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আবেদনকারী আর দ্বিতীয় সুযোগ পাবেন না।
নতুন এ বিধির কারণে কোন নোটিশ ছাড়াই এখন ভিসা বর্ধিত করা, গ্রিনকার্ড কিংবা নাগরিকত্বের জন্য করা আবেদন সরাসরি প্রত্যাখ্যান করতে পারবেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ফলে অনেক বৈধ ভিসাধারীর সঙ্গে সঙ্গে আমেরিকা থেকে বিতাড়নের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আমেরিকার অভিবাসনের দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া মেনে করা আবেদন শুধু ক্ষুদ্র দু-একটি ভুলের কারণে কিংবা অসম্পূর্ণ আবেদনের কারণে বাতিল হয়ে যাবে।

অভিবাসন আইনজীবীরা বলছেন, ধরা যাক, আমেরিকান স্ত্রীকে বিয়ের পর গ্রিনকার্ডধারী স্বামী নাগরিকত্বের আবেদন করেছেন। কিন্তু আবেদনটি অসম্পূর্ণ। আবেদনের সঙ্গে স্ত্রীর নাগরিকত্বের সনদ যুক্ত করতে ভুলে গেছেন তিনি। এমন পরিস্থিতিতে আবেদনকারীকে কোনো দ্বিতীয় সুযোগ না দিয়েই আবেদন বাতিল করা যাবে নতুন বিধির আওতায়।

এমন পদক্ষেপের কারণ হিসেবে অভিবাসন বিভাগের মুখপাত্র মাইকেল বারস বলেন, অসম্পূর্ণ ও ভুলে ভরা অভিবাসন আবেদনের সংখ্যা কমিয়ে আনতেই এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, অভিবাসনের আবেদনের সময় সংশ্লিষ্টরা যথেষ্ট মনোযোগ দেন না। ফলে ওই আবেদনকারীর সঙ্গে অভিবাসন বিভাগের বারবার যোগাযোগ করতে হয়। এতে দীর্ঘসূত্রতা বাড়ে, সঙ্গে ব্যয়ও। আইন অনুযায়ী অভিবাসনের জন্য আবেদনের যথার্থতা প্রমাণের দায়িত্ব আবেদনকারীর; অভিবাসন বিভাগের নয়।

এদিকে নতুন বিধির কারণে আমেরিকায় বৈধ অভিবাসন ভীষণ কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন অভিবাসন আইনজীবীরা। তাঁদের মতে, এখন অভিবাসন বিভাগের কর্মকর্তারা নিজের ইচ্ছা মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। অভিবাসন সম্পর্কিত অনেক জটিল সিদ্ধান্ত কর্মকর্তারা একতরফাভাবে নেবেন।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিবাসন সংকোচনে তাঁর দেওয়া ঘোষণা বাস্তবায়নে নানাভাবে এগিয়ে যাচ্ছেন। পারিবারিক অভিবাসন বন্ধের হুমকি দিয়ে রেখেছেন তিনি। এ নিয়ে কংগ্রেসে আইন প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে আগেই। ট্রাম্প চান বাছাই করা অভিবাসীদের আমেরিকায় আসার সুযোগ দিতে। এ ক্ষেত্রে মুসলিম প্রধান দেশ বা কর্মে অদক্ষ জনগোষ্ঠীর দেশ থেকে আমেরিকায় আসাটা কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ এ দুই ক্ষেত্রেই ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ আরোপের চেষ্টা করছে প্রশাসন। এরই অংশ হিসেবে বৈধ অভিবাসীদের আমেরিকায় থাকাটা কঠিন করে তুলতে এ বিধি আরোপ হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কংগ্রেসকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। সমন্বিত অভিবাসন আইনের জন্য আইন প্রণেতাদের ঐক্যের প্রয়োজন। আপাতত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাই সে পথে হাঁটছেন না। ডাকা কর্মসূচি বাতিল কিংবা মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল নির্মাণ প্রশ্নে কংগ্রেসকে নিজের পক্ষে আনতে পারেননি ট্রাম্প। ফলে কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে তিনি অনেকটা আড়ালেই অভিবাসনে এ ‘অদৃশ্য দেয়াল’ নির্মাণ করেছেন।

এ বিষয়ে নিউইয়র্কের অভিবাসন আইনজীবী পিয়েরে বনেফিল বলেন, ‘কর্মকর্তারা এখন ইচ্ছে হলেই একটি অভিবাসন আবেদন বাতিল করে দিতে পারবেন। এমনকি এর নজির এরই মধ্যে দেখা যাচ্ছে। আবেদনে সব সংযুক্তি দেওয়ার পরও নথিপত্র সঠিকভাবে সাজিয়ে দেওয়া হয়নি বলে আবেদন বাতিলের খবর এরই মধ্যে পাওয়া গেছে।’

অভিবাসন আইনজীবী সান্ড্রা ফেইস্ট বলেন, ‘আমেরিকায় বৈধ অভিবাসীরাও এখন অবৈধ অভিবাসীদের মতো নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। অভিবাসন আইনের সবকিছু মেনে অভিবাসী হওয়ার স্বপ্ন দেখা অনেকেই এখন নিজেদের এ দেশে অপাঙ্‌ক্তেয় মনে করছেন। এ বিধির মাধ্যমে অভিবাসীদের কাছে একটি সাধারণ বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে যে, তোমাকে এ দেশে আর স্বাগত জানানো হচ্ছে না। যেকোনো অজুহাতে অভিবাসীদের বিদায় করার জন্য নানা রকম বিধি আরোপ করা হচ্ছে।’

এ অবস্থায় অভিবাসীদের সতর্ক হতে হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন অভিবাসন আইনজীবীরা। তাঁদের মতে, এখন থেকে গ্রিনকার্ড বা ভিসার আবেদন করার আগে ভালোভাবে সবকিছু পরখ করে নিতে হবে। আমেরিকায় আসা অভিবাসীদের অধিকাংশেরই মাতৃভাষা ইংরেজি নয়। অনেক সময়েই আবেদনকারী প্রশ্ন না বোঝার কারণে আবেদনের সমর্থনে প্রয়োজনীয় নথি দিতে ভুল করেন। কিন্তু নতুন বিধি আরোপের ফলে যেকোনো তথ্য প্রদানে ভুল হলে, এমনকি প্রশ্ন না বুঝে তথ্য-উপাত্ত বা সংশ্লিষ্ট নথি শতভাগ না দিলে যেকোনো আবেদন বাতিল হয়ে যেতে পারে। ফলে শুরুতেই সতর্ক হতে হবে।