রক্তের বন্ধনে ৭০ হাজার মানুষ

প্রায় ৭০ হাজার মানুষের হাতে নিজের রক্তের গ্রুপ লেখা কার্ড। ১৬৪ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রক্তদাতা ক্লাব। ২২ হাজার শিক্ষার্থী মাসে একবার নিজেদের রক্তের গ্রুপ লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে স্কুলে সমাবেশ (অ্যাসেম্বলি) করছে। এতে সহপাঠীরা একে অন্যের রক্তের গ্রুপ মনে রাখতে পারে আর জরুরি দরকারে একে অন্যের পাশে দাঁড়াতে পারে।

এই চিত্র রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার। রক্তের গ্রুপ জানা এবং অন্যের প্রয়োজনে স্বেচ্ছায় রক্তদানের অনন্য উদ্যোগের ফলে ইতিমধ্যে স্বেচ্ছায় রক্তদাতার তালিকায় নাম লিখেছে ৮০১ জন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জিলুফা সুলতানা এই উদ্যোগ নিয়েছেন।
২০১৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রায় ৩০ হাজার মানুষকে নিয়ে এক ঘণ্টায় ১৫৩টি রাস্তায় ৪০ প্রজাতির আড়াই লাখ গাছের চারা রোপণ করে আলোচনায় আসেন সরকারি কর্মকর্তা জিলুফা সুলতানা। ইতিমধ্যে ‘জিলুফা মডেল’ অনুসরণ করে দেশের সব উপজেলায় গাছ লাগানোর নির্দেশ দিয়েছে সরকারের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
২০১৬ সালে তিনি বৃক্ষরোপণে প্রধানমন্ত্রীর পুরস্কার পান।
জিলুফা সুলতানা বলেন, গাছ লাগানোর পর তিনি আলোকিত তারাগঞ্জ ডেটাবেইস তৈরির কাজে মনোনিবেশ করেন। স্কাউট সদস্যদের বাড়ি বাড়ি পাঠিয়ে প্রতি পরিবারের প্রায় ১৪৮ ধরনের তথ্য সংগ্রহ করান। ৩০ জন যুবককে উপজেলা পরিষদে মাসব্যাপী ডেটা এন্ট্রির প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজে নামিয়ে দেন। ইউএনও বলেন, তাঁদেরই একজন ‘আমরাও পারি’ সামাজিক সংগঠনের সভাপতি শিকড় ইসলাম খানার তথ্যে রক্তের গ্রুপ যুক্ত করার প্রস্তাব দেন। এরপর রক্তের গ্রুপ নির্ণয়ের চিন্তা মাথায় আসে।
উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান ও পাঁচটি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলেন ইউএনও। তাঁরা এগিয়ে আসেন। ৫টি ইউনিয়নের ৪৫টি ওয়ার্ডে সভা করেন ইউএনও। এসব সভার মাধ্যমে জনপ্রতিনিধি, ইমাম, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী, কৃষকসহ সব পেশার মানুষকে এ কাজে যুক্ত করা হয়।
‘রক্ত দিয়ে দেশ পেয়েছি, রক্তদানে জীবন পাব’ স্লোগানে গত বছরের ১৬ ডিসেম্বর তারাগঞ্জ ও/এ ডিগ্রি কলেজ মাঠে ২৫ জন মুক্তিযোদ্ধার রক্তের গ্রুপ নির্ণয়ের মাধ্যমে এ কাজ শুরু হয়। এরপর ‘নিজের রক্তের গ্রুপ জানি, রক্ত দিয়ে কাছে টানি’ স্লোগানে কাজ চলতে থাকে। ৫টি ইউনিয়নে গঠন করা হয় ৬০টি সহায়তা কমিটি। শিক্ষক-শিক্ষার্থী, চিকিৎসক, ইমাম, জনপ্রতিনিধি, ন্যাশনাল সার্ভিসের সদস্য-সবাইকে কমিটিতে রাখা হয়। কমিটির সদস্যরা সভা করে মানুষকে সচেতন করেন। মসজিদ, হাটবাজার ও গ্রামে মাইকিং করা হয়। রংপুরের একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজের একদল প্যাথলজিস্ট প্রথমে ১৬৪টি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় গিয়ে স্বল্প খরচে প্রায় ২২ হাজার শিক্ষার্থীর রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করে দেন। এরপর ইউপির উদ্যোগে মাইকিং করে গ্রামে লোকজন জড়ো করে রক্তের গ্রুপ নির্ণয়ের ক্যাম্প করা হয়। এভাবে তিন মাসে প্রায় ৭০ হাজার মানুষের রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করা হয়।
উপজেলা সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা সাদেকুল ইসলাম বলেন, গ্রুপ নির্ণয়ের পর ১ হাজার ৭২৫ জন ন্যাশনাল সার্ভিসম্যান রক্তের গ্রুপ লেখা কার্ড বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেন।
স্কুলে ব্লাড ক্লাব করার বিষয়ে জানতে চাইলে জিলুফা সুলতানা বলেন, শিক্ষার্থীদের ছোটবেলা থেকেই নিজেদের রক্তের গ্রুপ জানানোটাই উদ্দেশ্য। পাশাপাশি তারা জানুক নিজ গ্রুপের আর কোন কোন সহপাঠী আছে। তাহলে রক্তের প্রয়োজন হলে তারা আর নিজেদের অনিরাপদ ভাববে না। তিনি বলেন, এই ১৬৪টি ক্লাব প্রতিষ্ঠানে নতুন শিক্ষার্থী আসলে তার রক্তের গ্রুপ করে কার্ড দেওয়ার ব্যবস্থা করবে। ইউনিয়ন কমিটিগুলো এই কাজ চালিয়ে গেলে খুব দ্রুতই তারাগঞ্জের বাকি এক লাখ মানুষের রক্তের গ্রুপ করা হয়ে যাবে।
উপজেলার মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শাহনাজ পারভিন বলেন, রক্তের গ্রুপ নির্ণয়ে যে সামান্য খরচ হয়েছে, তা বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি ও শিক্ষকেরা দিয়েছেন। তারাগঞ্জ উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি হরিপদ রায়, স্কুলের সমাবেশে রক্তের গ্রুপ অনুযায়ী সার বেঁধে দাঁড়ানোয় এ বিষয়ে দারুণ সচেতনতা তৈরি হয়েছে। ইকরচালী ডিগ্রি কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী খাদিজা খাতুন বলে, ‘এখন আমি নিজের এবং বন্ধুদের রক্তের গ্রুপ জানি। কারও প্রয়োজন হলে রক্ত দিয়ে সহায়তা করব আমরা। ’
ফকিরপাড়া গ্রামের দিনমজুর ছমছেরের স্ত্রী বেগম নাহার (৫৮) বলেন, ‘মুইও শেষ বয়সোত মোর শরীরের অক্তের (রক্ত) নাম জানো। এ্যালা মুই অন্য মাইনসোক অক্ত দিবার পাইম, নিবারও পাইম। ’
এরপর স্বেচ্ছায় রক্তদানের আবেদন জানালে প্রায় ৮০১ জন নারী-পুরুষ নাম নিবন্ধন করেন। তাঁদের নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর ইউনিয়ন পরিষদ, কমিউনিটি ক্লিনিক, উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্র, উপজেলা নির্বাহী অফিসে রাখা আছে। কারও রক্তের দরকার হলে এদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে বিনা মূল্যে রক্ত পাওয়া যায়।
ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের তোজাম্মেল হকের (৫৫) অস্ত্রোপচারের সময়, দুই মাস আগে প্রামাণিকপাড়া গ্রামের শরিফুলের স্ত্রী খয়রন বেগম (২২) বাচ্চা প্রসবের সময় এই স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের কাছ থেকে রক্ত নেন। মেনানগর গ্রামের গৃহবধূ জোহরা বেগমের (৫০) শরীরে দুই মাস পরপর রক্ত দিতে হয়। হাজীপুর গ্রামের আসাদুজ্জামান ও তারাগঞ্জের ইউসুফ আলী তাঁকে রক্ত দিয়েছেন এবার। আগে হাসপাতাল থেকে রক্ত সংগ্রহ করতে হতো।
তিনবার রক্ত দিয়েছেন মেনানগর গ্রামের নুর আলম। তিনি বলেন, ‘রক্তদান মহৎ কাজ। ইউএনওর কারণে আমরা সেটা করতে পারছি। ’ আর সেই যুবক শিকড় ইসলাম বললেন, ‘এই মহৎ কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। আমাদের কাছে তিনি অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। ’
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মোস্তফা জামান চৌধুরী বলেন, একজন সুস্থ মানুষ চার মাস পরপর রক্ত দিতে পারে। নিয়মিত রক্ত দিলে শরীর সুস্থ থাকে। রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ে।
সয়ার ইউপির চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন আজম ও ইকরচালী উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাইফুল ইসলাম বলেন, ছেলেমেয়েরা এখন তাদের রক্তের গ্রুপ জানে। এলাকার কেউ অস্ত্রোপচার করতে গেলে এখন তাদের রক্ত নিয়ে ভাবতে হয় না। উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান বলেন, ‘প্রশাসন এ রকম ভালো কাজের উদ্যোগ নিলে উপজেলা পরিষদ ভবিষ্যতেও পাশে থাকবে। ’
নিজের ভাবনার বিষয়ে জানতে চাইলে পশ্চিমবঙ্গের শিল্পী শুভমিতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘যদি বন্ধু হও যদি বাড়াও হাত’ গানটির দুটি লাইন উদ্ধৃত করলেন ইউএনও জিলুফা সুলতানা, ‘সবার রঙে মিশলে রং, সুরে মিললে সুর। হবে পুরোনো যত দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দূর। ’ জীবন হচ্ছে সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়া।
ইউএনওর এ কাজ সারা দেশে অনন্য নজির হয়ে থাকবে বলে মন্তব্য করেন রংপুরের জেলা প্রশাসক এনামুল হাবীব।
দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, এই ইউএনও নিঃসন্দেহে বিরল কাজ করেছেন। নিজে থেকে করেছেন। তাঁর কাজ ওই জনপদের মানুষের মনে স্থায়ী ছাপ ফেলবে। বিশেষ করে এই কাজটির কারণে সেখানকার মানুষ স্বাস্থ্যসচেতন হবে। তাঁর গাছের চারা রোপণের যে মডেল, তা দেশের পরিবেশের ওপর একটা টেকসই প্রভাব ফেলবে। সব মিলে এসব কাজ করতে গিয়ে এলাকার মানুষের মধ্যে যে বন্ধন তৈরি হচ্ছে, তাতে তারা সাংস্কৃতিকভাবে আরও সচেতন হয়ে উঠবে।