ছোট মানুষের বড় লড়াই

বনের গভীরে বাস। বনের যেখানে কারও পা ফেলার সাহস নেই, সেখানে স্বচ্ছন্দে হেঁটে বেড়ায় তারা। বনের সঙ্গে বেড়ে ওঠা বলে গাছের প্রতিটি পাতাই যেন তাদের চেনা। প্রাণী বা পাতা শিকারি মানুষদের সহচর হিসেবে তারা বনের পথ চিনিয়ে নিয়ে যায়। হাতির হাড়গোড় পাচারকারীরা তাদের ব্যবহার করে।

গাছের পাতা, লতা, গুল্ম পেতে কিছু মানুষ ফরমাশ দেয়। অর্থের বিনিময়ে এসব কাজ করে থাকে পিগমি জাতিগোষ্ঠীর বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ। বনে বাস করলেও নাগরিক সব সুবিধা পেতে ধীরে ধীরে তারা সোচ্চার হচ্ছে। তাদের দিকে কর্তৃপক্ষের নজর তেমন নেই। অধিকারবঞ্চিত জীবন নিয়ে টিকে থাকার জন্য প্রতিমুহূর্তে লড়াই করে চলেছে পিগমিরা।

এমন সংগ্রামী পিগমিদের কথা উঠে এসেছে এএফপির প্রতিবেদনে। কঙ্গো ও মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্রের কাছে গ্যাবন ও ক্যামেরুন সীমান্তবর্তী বিস্তৃত বন এলাকায় বাকা সম্প্রদায়ের পিগমি লোকজনের বাস। মধ্য আফ্রিকার পশ্চিমাঞ্চলের দেশ গ্যাবনের ক্ষুদ্র আদিমতম জাতিগোষ্ঠী পিগমি, যারা খর্বকায় বা বামুন হিসেবে পরিচিত।

গ্যাবনের উত্তরের একটি গ্রাম দৌমাসির বাসিন্দা বাকা সম্প্রদায়ের ইবোনা নামের একজন পিগমি জানান, তিনি ফরমাশ অনুযায়ী বন থেকে পাতা তুলে আনেন। বনের যেখানে কেউ পা মাড়ায় না, সেখান থেকে তিনি লতা, পাতা, গুল্ম সংগ্রহ করেন। কুঁড়েঘরের সামনে উঠানে বসে তিনি কথা বলছিলেন। বললেন, ‘এই পাতাগুলো খুঁজে দিতে শহরের লোকজন আমাকে অর্থ দেয়।’

জিন নামে বাকা সম্প্রদায়ের একজন জানান, এটাই তাঁদের বাড়িঘর। এটাই তাঁদের সবকিছু। এখানেই শিকার করেন, থাকেন, ঘুমান।

বাকা পিগমিদের প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্কটা বেশ জটিল। ওই অঞ্চলের প্রধান ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ফ্যাং সম্প্রদায়ের লোকজন তাদের শিশু হিসেবে বিবেচনা করে এবং পাত্তা দেয় না বলে অভিযোগ রয়েছে বাকাদের। গ্যাবনে বৈধ অস্তিত্বের জন্যও তাদের লড়াই করতে হয়। তাদের কোনো পরিচয়পত্র নেই, যা তাদের জীবনকে আরও জটিল করে তুলেছে।

ক্রিশ্চিয়ান নামের একজন গ্রামবাসী বলেন, ‘আমি শতভাগ গ্যাবনিজ। অথচ আমার কোনো পরিচয়পত্র নেই। তারা আশ্বাস দেয় যে পাব। কিন্তু এখনো আমরা সেই অপেক্ষাতেই আছি…’

বাকা সম্প্রদায়েরও অন্য লোকজনের মতো ক্রিশ্চিয়ানও নাগরিক অধিকার চান। হতাশার সুরে তিনি বলেন, ‘আমি কীভাবে আমার ছেলেমেয়েকে স্কুলে পাঠাব? কীভাবে ভোট দেব? কীভাবে চিকিৎসাসেবা পাব?’

গ্যাবনে আগামী ৬ অক্টোবর প্রথম দফায় জাতীয় নির্বাচন হবে। এর পরের মাসে হবে দ্বিতীয় দফা নির্বাচন। নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহ বাকি থাকলেও কর্তৃপক্ষ বাকা সম্প্রদায়ের প্রাপ্তবয়স্ক মানুষদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য তেমন কোনো ভূমিকাই রাখেনি। অথচ বাকা সম্প্রদায়ের অনেক মানুষের রাজনীতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা আছে। তাঁরা বলেন, তাঁরা বেঁচে থাকার এ লড়াইয়ে টিকে থাকতে চান।

পিগমিদের জন্য স্থানীয় সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন ফর ফ্যামিলি মেডিয়েশন (এএমএফ) জিন-ব্যাপটিস্ট অনডজাঘা-ইওয়াকের হয়ে কাজ করে। এই এনজিও বাকা সম্প্রদায়ের শিশুদের জন্ম রেকর্ড রাখে, যেন তারা স্কুলে যেতে পারে ও স্বাস্থ্যসেবা পায়। স্বাস্থ্যসেবার অভাবে গ্রামের নরবার্ট নামের এক ব্যক্তির স্ত্রীর সাতটি সন্তানের মধ্যে পাঁচটি অপরিণত অবস্থায় মারা যায়। এই মুহূর্তে তাঁর স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা বলে জানিয়েছেন তিনি।

বনে নীরব-শান্ত পরিবেশে বসবাসে অভ্যস্ত বাকা সম্প্রদায়ের লোকজন খুব বেশি প্রয়োজন না হলে বাইরে বের হতে চায় না। তামাকজাত দ্রব্য, সাবান, অ্যালকোহল ও পেট্রলের মতো জিনিস কেনার প্রয়োজন ছাড়া গাড়ির শব্দের কোলাহল যেখানে, সেখানে তারা যেতে খুব একটা পছন্দ করে না।

ফ্যাং সম্প্রদায়ের লোকজন বাকাদের আকৃতির জন্য পাত্তা না দিলেও ফ্যাংদের জন্য প্রায়ই শিকার করে দেয় বাকারা। ফ্যাংরাও স্বীকার করে, বাকারা দক্ষ শিকারি। তাদের নিশানা কখনো ব্যর্থ হয় না।

রিগোবার্ট নামে ফ্যাং সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তি বলেন, শিকারে বাকাদের হাতের নিশানা খুবই পাকা। তিনি জানান, তাঁর জন্য শিকার করে দিতে দুজন বাকাকে পাঠিয়েছিলেন তিনি। সঙ্গে একটি পুরোনো বন্দুক ও এক ডজন কার্তুজ দিয়েছিলেন। ওই দুজন তাঁর জন্য তিনটি প্রাণী শিকার করে নিয়ে আসেন।

জিন নামের ওই বাকা সম্প্রদায়ের মানুষটি বলেন, সেনাবাহিনী তাঁকে সদস্য হতে বলেছিল। কিন্তু তিনি নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমার পরিবার আছে, আমি একজন শিকারি। এটাই আমার পরিচয়। কেন আমি নিজেকে পাল্টাব?’ জিন জানান, বনে একটি প্রাণীকেই তিনি ভয় পান, সেটি হচ্ছে গরিলা। তাঁর মতে, গরিলা মানুষের মতো আচরণ করে। বোঝা যায় না, কখন কী করে বসবে।

বন্য প্রাণী নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক এনজিওগুলো গাইড হিসেবে বাকাদের ভাড়া করে থাকে। শহরের বাসিন্দারা বন্য প্রাণীর মাংস ও মূল্যবান গাছ এনে দেওয়ার জন্য তাদের অর্থ দিয়ে থাকে। তবে বাকাদের হাতির দাঁতের জন্য হাতি খুঁজে বের করতে নিয়োগ দেয় পাচারকারীরা।

ক্যামেরুনের পাচারকারীদের সঙ্গে প্রায়ই হাতি শিকারে যান বলে জানান জিন। তিনি বলেন, ‘এক গুলিতেই আমি হাতি মারতে পারি। কানের পেছনে গুলি করে মেরে ফেলি। একই সঙ্গে তিনি বিপন্ন প্রাণীদের রক্ষার কাজে এনজিওগুলোর জন্য ট্র্যাকার হিসেবে কাজ করেন। তবে আইনের প্রতি কোনো ‘ভালোবাসা’ নেই জিনের।

জিন বলেন, ‘আমি সব সময় হাতির মাংস খাই। এটা আমাদের বাড়ি। আর এই মাংস আমাদের।’ হাতি মারা খুবই লাভজনক সেখানে। একেকটি হাতি মারতে আকার অনুসারে ৩৪৮ থেকে ৫২২ ডলার পর্যন্ত পান জিন।

প্রতিবেদনে বন কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য তুলে ধরে জানানো হয়, গ্যাবনের উত্তর-পূর্বে হাতির প্রধান আশ্রয়স্থল মিনকেবে ন্যাশনাল পার্কে এক দশকেই ৮০ শতাংশ হাতিকে গলা কেটে মারা হয়েছে।