মিয়ানমার: গণহত্যার অভিযোগ

এত দিন ঘুরিয়ে গণহত্যার কথা বলা হতো। মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে বিতাড়নের ঘটনায় ‘গণহত্যার পদচিহ্ন’ রয়েছে বলেছিলেন জাতিসংঘের হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলের প্রধান। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রসিকিউটর বলেছিলেন সেখানে মানবতাবিরোধী অপরাধের কথা। এবার জাতিসংঘের নিয়োগপ্রাপ্ত একটি স্বাধীন তথ্যানুসন্ধান মিশন সরাসরি বলছে, মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে গণহত্যাই সংঘটিত হয়েছিল। মাত্র কয়েক দিন আগে মিশন রাখাইনে গণহত্যার জন্য মিয়ানমারের ছয় শীর্ষস্থানীয় সামরিক কর্মকর্তাকে দায়ী করে তাঁদের বিরুদ্ধে তদন্তের প্রস্তাব করেছে। মিয়ানমারের ঘটনাবলি বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) কাছে এটি রেফারেল বা প্রেরণের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।

গণহত্যা সবচেয়ে জঘন্য একটি আন্তর্জাতিক অপরাধ। এটি মানবতাবিরোধী অপরাধের চেয়ে গুরুতর। ১৯৪৮ সালের গণহত্যাবিষয়ক আন্তর্জাতিক কনভেনশন এবং ২০০২ সালের রোম স্ট্যাটিউটে অভিন্নভাবে একে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। সেই অনুসারে কোনো ধর্মীয়, জাতিগত বা বংশগত জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস (ডেস্ট্রয়) করার সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে হত্যা করার গুরুতর অপরাধকে গণহত্যা বলা হয়। অন্যদিকে এ ধরনের কোনো উদ্দেশ্য ছাড়াই কোনো জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ও ব্যাপক ধর্ষণ, হত্যা ও বিতাড়নের (ডিপোর্টেশন) অপরাধকে মানবতাবিরোধী অপরাধ বলা হয়।

গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের জন্য রোম স্ট্যাটিউটের মাধ্যমে ২০০৭ সালে একটি স্থায়ী আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) গঠন করা হয়। আইসিসি বাকি যে দুটো অপরাধের বিচার করতে পারে তা হচ্ছে যুদ্ধাপরাধ এবং অন্য দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসন। মিয়ানমার রোম স্ট্যাটিউটের পক্ষরাষ্ট্র না হলেও তার নাগরিকদের বিরুদ্ধে আইসিসিতে বিচারের সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ রোম স্ট্যাটিউটের পক্ষরাষ্ট্র। ফলে বাংলাদেশের অধিকার রয়েছে এই বিচারের দাবিকে জোরদার করার। এটি করতে পারলে ভবিষ্যতে আসামসহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে ‘বাঙালি’ বলে অভিহিত মানুষজনকে বাংলাদেশে বিতাড়নের যে আশঙ্কা রয়েছে, তা কিছুটা হলেও নিরসন হতে পারে।

২.

আইসিসিতে ইতিমধ্যে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের’ জন্য মিয়ানমারের দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তদন্ত করা যাবে কি না, এটি বিবেচনাধীন। আইসিসির প্রি-ট্রায়াল চেম্বারের কাছে বিষয়টি খতিয়ে দেখার সুপারিশ করেছিলেন এর প্রসিকিউটর ফাতো বেনসুধা। চেম্বার এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের কাছে তাঁর মতামত ও পর্যবেক্ষণ পাঠাতে বলেছিলেন এ বছরের ১১ জুনের মধ্যে। বাংলাদেশ তার মতামত দিয়েছে নির্দিষ্ট সময়ে।

বাংলাদেশের অভিমতে কী আছে, তা জানা যায়নি। তবে ফাতো কী কারণে মনে করেন মিয়ানমার রোম চুক্তির পক্ষরাষ্ট্র না হলেও তার ক্ষেত্রে তদন্ত করা যেতে পারে, তা তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন। তাঁর যুক্তি, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ডিপোর্টেশন নামক মানবতাবিরোধী অপরাধটি সংঘটিত হয়েছে তাদের মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশ পর্যন্ত বিতাড়ন অবধি। রোহিঙ্গা বিতাড়নের অপরাধটি রোম চুক্তির একটি পক্ষরাষ্ট্রের (বাংলাদেশ) ভূখণ্ডে আংশিকভাবে হলেও সংঘটিত হয়েছে বলে টেরিটরিয়াল জুরিসডিকশনের নীতি অনুসারে এর তদন্তের এখতিয়ার আইসিসির রয়েছে। অপরাধ তদন্ত ও বিচার তাই বলে এক জিনিস নয়। আইসিসি যদি তদন্তের পক্ষে অনুমোদনও দেয়, অভিযুক্তরা মিয়ানমারে অবস্থান করলে তাদের গ্রেপ্তার বা বিচার সম্ভব হবে না। তবে আইসিসির তদন্ত মিয়ানমারের অপরাধীদের বিচারে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে। জাতিসংঘের তথ্যানুসন্ধান মিশনের প্রতিবেদন এ সম্ভাবনাকে কিছুটা হলেও বৃদ্ধি করেছে। এই মিশন মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুধু নয়, গণহত্যার মতো গুরুতর অপরাধের বিচার দাবি করছে। বিচারের জন্য নির্দিষ্টভাবে দায়ী ব্যক্তিদেরও চিহ্নিত করেছে। নিরাপত্তা পরিষদের পক্ষে এসব দাবি অগ্রাহ্য করা কঠিন। করলে পরিষদের কর্মকাণ্ড নিয়ে বিতর্ক আরও বাড়বে।

৩.

রোম চুক্তি অনুসারে নিরাপত্তা পরিষদ আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে সরাসরি কোনো পরিস্থিতি আইসিসির কাছে বিচারের জন্য পাঠাতে পারে। ফলে মিয়ানমারের মতো পক্ষরাষ্ট্র নয়, এমন দেশের নাগরিকদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক কোনো অপরাধের জোরালো অভিযোগ এলে তা নিরাপত্তা পরিষদ আইসিসির কাছে পাঠাতে পারে। তবে নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচটি স্থায়ী রাষ্ট্রের মধ্যে একটি রাষ্ট্রও ভেটো দিলে এটি করা আর সম্ভব হবে না। অতীতে সুদানের দারফুর ও লিবিয়ায় সংঘটিত আন্তর্জাতিক অপরাধ তদন্তের জন্য নিরাপত্তা পরিষদ আইসিসির কাছে পাঠিয়েছিল। আইসিসি তদন্ত শেষে যথাক্রমে প্রেসিডেন্ট বাশির ও গাদ্দাফির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করেছিলেন।

নিরাপত্তা পরিষদ একই কাজ মিয়ানমারের বিরুদ্ধে করবে কি না, তা নিয়ে অবশ্য সন্দেহের কারণ রয়েছে। সিরিয়ায় সংঘটিত অপরাধের জন্য ২০১৪ সালে নিরাপত্তা পরিষদে এমন একটি প্রস্তাব এলে রাশিয়া ও চীন তাতে ভেটো দেয়। দেশ দুটির যুক্তি ছিল, এটি সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ সমাধানে আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং সেখানে শান্তির সম্ভাবনাকে আরও বিঘ্নিত করবে। এই যুক্তি পৃথিবীর বহু রাষ্ট্র ও মানবাধিকার সংগঠনের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। তখন এমন কথাও বলা হয়েছিল যে মাত্র ৩০০ ব্যক্তিকে হত্যার পর লিবিয়ার পরিস্থিতি তদন্ত করে দেখতে বললেও ৪০ হাজার ব্যক্তির প্রাণহানির পরও কেন নিরাপত্তা পরিষদ সিরিয়ার পরিস্থিতি আইসিসির কাছে পাঠাতে ব্যর্থ হলো?

পর্যবেক্ষকেরা এই ব্যর্থতার জন্য নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যরাষ্ট্রগুলোর আঞ্চলিক প্রভাব বজায় রাখার রাজনীতিকেই দায়ী করেছিলেন। পরে পৃথিবীর অর্ধশতাধিক দেশ, বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা এবং জাতিসংঘের মহাসচিবের বহু অনুরোধের পরও নিরাপত্তা পরিষদে এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি।

মিয়ানমারের ক্ষেত্রে একই ধরনের ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে প্রস্তাব নেওয়ার সময় চীন ও ভারত আপত্তি করেছে। নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমারের পরিস্থিতি আইসিসিতে প্রেরণের কোনো প্রস্তাব এলে চীন ভেটো দেবে, এটি প্রায় নিশ্চিত। মিয়ানমারে মার্কিন প্রভাব সৃষ্টির যেকোনো পদক্ষেপ বিরোধিতার নীতি থেকে এবং অর্থনৈতিক স্বার্থে রাশিয়াও ভেটো দিতে পারে।

তবে এত কিছুর পরও জাতিসংঘের তথ্যানুসন্ধান মিশনের প্রস্তাব মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনাকে অন্তত বাড়াবে। আইসিসির প্রি-ট্রায়াল চেম্বারে বিষয়টি তদন্তের সিদ্ধান্ত হলে বিচারের দাবি আরও জোরদার হবে। ইউরোপ ও আমেরিকা এবং তাদের প্রভাবাধীন আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংস্থাগুলো মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আরও বিভিন্ন কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও গ্রহণ করতে পারে এর জের হিসেবে।

মিয়ানমার সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের উচিত এই পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা এবং সেই অনুসারে পদক্ষেপ গ্রহণ করা। এই উদ্দেশ্যে পররাষ্ট্র দপ্তরে কোনো বিশেষ সেল বা অফিস খোলার কথা সরকার ভেবে দেখতে পারে।

৪.

মিয়ানমারে গণহত্যার প্রসঙ্গটি জাতিসংঘের তদন্তে উঠে আসার পর বাংলাদেশ সরকার আরও একটি কাজ করতে পারে, তা হচ্ছে ১৯৪৮ সালের গণহত্যা কনভেনশন অনুসারে মিয়ানমার রাষ্ট্রীয় দায়দায়িত্বের বিষয়টি ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে (আইসিজে) তোলার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা। এই কনভেনশন অনুসারে মিয়ানমারে গণহত্যা নিবারণ করা এবং গণহত্যা হলে তার বিচার করার দায়দায়িত্ব মিয়ানমারের রয়েছে। ১৯৫৬ সালে এর পক্ষরাষ্ট্র হওয়ার সময় মিয়ানমার (তখনকার বার্মা) তার নাগরিকদের বিচারে ভিনদেশির কোনো ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার থাকবে না বলে ঘোষণা দিয়েছিল। কনভেনশনের অনুচ্ছেদ ৮ অনুসারে গণহত্যার বিরুদ্ধে জাতিসংঘের কোনো প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা চাওয়ার বিধানটিতেও দেশটি আপত্তি করেছিল। কিন্তু রাষ্ট্রীয় দায়দায়িত্বের প্রসঙ্গটি রয়েছে অন্য একটি অনুচ্ছেদে, অনুচ্ছেদ ৯-এ।

গণহত্যা কনভেশনটিতে বাংলাদেশ পক্ষরাষ্ট্র হয়েছিল ১৯৯৮ সালে। তখন বাংলাদেশ অনুচ্ছেদ ৯-এ আপত্তি জানিয়ে বলেছিল যে কোনো বিরোধ আইসিসিতে নিতে হলে বিরোধের সব পক্ষরাষ্ট্রের সম্মতি লাগবে। এই আপত্তি প্রত্যাহার করে কনভেনশনের অধীনে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় দায়দায়িত্বের বিষয়টি আইসিসিতে প্রেরণের সুযোগ আছে কি না, তা ভেবে দেখা প্রয়োজন।

রোহিঙ্গাদের সংকট শুধু মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার উপায় নেই। এই মানবিক সংকটের পেছনের অপরাধগুলোর বিচারে বাংলাদেশ সোচ্চার না হলে এমন আরও সংকটের ভিকটিম বা শিকার আমরা হতে পারি ভবিষ্যতে।

collected from প্রথম আলোর – writer: আসিফ নজরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক