১০ বছরে জনতা ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারি ১৫ হাজার কোটি টাকা

রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকে গত ১০ বছরে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে। কেবল দুটি কোম্পানিকেই অনিয়মের মাধ্যমে ঋণ দেওয়া হয়েছে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। একটি কোম্পানিকে দেওয়া হয়েছে ১২শ কোটি টাকা। এতে ১০ বছরে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়, ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে ব্যাংকের নিয়মনীতির কোনো তোয়াক্কাই করা হয়নি। জাল রপ্তানি নথি, ভুয়া অ্যাকাউন্ট, দুর্বল প্রকল্পের জামানতের পরিমাণ ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বেশি দেখানোসহ নানা অনিয়মের মাধ্যমে গ্রাহককে বেশি ঋণ পাইয়ে দিতে সহযোগিতা করেছেন ব্যাংকটির ছোট থেকে বড় সব স্তরের কিছু অসাধু কর্মকর্তা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও জনতা ব্যাংক সূত্র জানায়, রাষ্ট্র মালিকানায় থাকা এই ব্যাংকটির প্রথম অনিয়মের বিষয়টি বেরিয়ে আসে ২০১৩ সালের দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে। সেই সময়ে দুদক ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনায় বিসমিল্লাহ গ্রুপসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ করে। ওই প্রতিষ্ঠানটি জনতা ব্যাংকের কাছ থেকে ১২শ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়।
দুদক ওই ঘটনায় ২০১৩ সালের ৩ নভেম্বরে বিসমিল্লাহ গ্রুপের এমডি ও চেয়ারম্যানসহ ৫৪ জনকে আসামি করে ১২টি মামলা করে দুদক। আসামিদের মধ্যে জনতা ব্যাংকের তিন শাখার ১২ জনসহ ৪১ জন বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তা রয়েছে। তবে ওই ঘটনায় ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের কাউকে বা ব্যবস্থাপনা পরিচালককে আসামি করা হয়নি। এমনকি দীর্ঘ পাঁচ বছরেও মামলার বিচারকার্য শেষ হয়নি। এতে হতাশ ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, পরিচালনা পর্ষদের অনুমতি ব্যতিরেকে কোনো ঋণ মঞ্জুর হয় না। আর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের প্রদত্ত তথ্যের ভিত্তিতেই ঋণ প্রদান করে পরিচালনা পর্ষদ। কিন্তু আসল অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া এবং দীর্ঘদিনেও বিচার না হওয়ায় অনিয়ম ক্রমেই বাড়ছে।
জনতা ব্যাংক সূত্র জানায়, বর্তমানে ব্যাংকটির অর্থের বেশিরভাগ রয়েছে দুটি কোম্পানির কাছে। এননটেক্স গ্রুপের কাছে ব্যাংকটির পাওনা সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে তাদের একটি কোম্পানি শীর্ষ ঋণ খেলাপির তালিকায় রয়েছে। আর ক্রিসেন্ট ও রিমেক্স ফুটওয়্যারের কাছে রয়েছে ৪ হাজার কোটি টাকা। যার বেশিরভাগই ঋণই খেলাপি। প্রায় সবগুলো ঋণই ২০০৮ সাল থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে প্রদান করা হয়েছে।
জনতা ব্যাংকের সিবিএ সভাপতি রফিকুল ইসলাম বলেন, বিসমিল্লাহ গ্রুপের ঋণ কেলেঙ্কারির সঙ্গে ব্যাংকটির তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিনুর রহমানের জড়িত থাকার বিষয়টি দুদকের অনুসন্ধানে আসে। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে পরবর্তীতে ধামাচাপা পড়ে যায়। তার সময়ই ঋণগুলো বিতরণ করা হয়।
২০০৮ সালের ২৮ জানুয়ারি থেকে ২০১৪ সালের ২৭ জুলাই পর্যন্ত ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন এস এম আমিনুর রহমান। তার ব্যবস্থাপনায় এত ঋণ কেলেঙ্কারির বিষয়ে তিনি জানান, তার সময়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ঋণসুবিধা পেলেও এর দায়ভার তার না। শাখা সবকিছু খুঁটিনাটি দেখে প্রধান কার্যালয়ে প্রস্তাব পাঠায়। প্রধান কার্যালয় সেই প্রস্তাব বিচার-বিশ্লেষণ করে ক্রেডিট কমিটির কাছে পাঠায়। ক্রেডিট কমিটি সুপারিশ করলে তার কাছে মেমো আসে। তখন তিনি মেমোতে সই করেন। তিনি আরো বলেন, ‘পর্ষদ বিবেচনা করে ঋণ দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে এমডির ঋণ দেওয়া না দেওয়ার কোনো ক্ষমতা নেই। দলগতভাবেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে গ্রাহককে ঋণ সুবিধা দেওয়া হয়।’
তৎকালীন সময়ের ব্যাংকটির পরিচালক ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক যে তথ্য উপস্থাপন করেছে সেই অনুযায়ী বোর্ড ঋণ অনুমোদন করেছে। কিন্তু আফসোসের বিষয় কেলেঙ্কারিগুলো যখন সামনে চলে আসলো তখন আইনের যথাযথ প্রয়োগ হয়নি। ফলে পরবর্তীতে এই ব্যাংকটিসহ আরো অনেকগুলো ব্যাংকেই অনিয়ম চলছে। মূলত অপরাধীরা ধরেই নিয়েছে যে, এর কোনো বিচার হবে না। কারণ সেই সময়ে জড়িতদের মূল হোতাদের আসামি করা হয়নি।
আমিনুর রহমান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যদিও তিনি বোর্ডে যে তথ্য দিয়েছেন সেই অনুযায়ীই ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। কিন্তু দেখার বিষয় তিনি কতটা স্বাধীনভাবে তথ্য উপস্থাপন করতে পেরেছিলেন। আইনের সঠিক প্রয়োগ হলে তিনিও আইনের আওতায় আসতেন। তখন জানা যেত এর পিছনে মূল কাঠি কার ছিল।
এ প্রসঙ্গে জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান লুনা শামসুদ্দোহা বলেন, ব্যাংকের এমডির কারণে হোক অথবা চেয়ারম্যানের কারণে হোক, বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্ব হলো এই ভুল যারা করেছেন তাদের শাস্তির আওতায় আনা। তা না হলে এই ধরনের ঘটনা বেসরকারি ব্যাংকগুলোতেও ঘটতে থাকবে।

Courtsey: আরিফুর রহমান তুহিন

amaderorthoneeti